Header Ads

Header ADS

হযরত লুকমান (আঃ)-এর দশটি নসিহত

 



হযরত লুকমান হাকিম (আ)-এর জীবন ও হিকমতের পরিচয়!


হযরত লুকমান হাকিম (আ:) কুরআনে নামোল্লেখপ্রাপ্ত একজন বিশিষ্ট হিকমতধারী ব্যক্তি। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে বলেন وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمَانَ الْحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لِلَّهِ وَمَن يَشْكُرْ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ .

(سورة لقمان، الآية (12)

তরজমা:

"আমি লুকমানকে হিকমত (জ্ঞান ও প্রজ্ঞা) প্রদান করেছি- 'তুমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও'। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে নিজেরই মঙ্গল করে।"


তাফসিরে ইবন কাসির:

ইবন কাসির বলেন fofa Raa لُقْمَانُ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا نَجَّارًا أَوْ خَيَّاطًا . একজন ইথিওপীয় (হাবশী) দাস, কাঠমিস্ত্রি বা দর্জি ছিলেন।) আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত না দিয়ে, কিন্তু মহান হিকমত ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন।


তাফসিরে কুরতুবী:

ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন

لُقْمَانُ لَمْ يَكُنْ نَبِيًّا وَلَكِنَّهُ أُوتِيَ الْحِكْمَةَ وَالْفِقْهَ وَالْفَهْمَ

"তিনি নবী ছিলেন না, বরং আল্লাহ তাঁকে গভীর প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও আল্লাহভীতি দান করেছিলেন।"


* তাঁর জন্মস্থান ও সময়কাল.


বেশিরভাগ মুফাসসির বলেন,


তিনি হাবশা (বর্তমান ইথিওপিয়া) অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, পরবর্তীতে

 বনী ইসরাইলের মধ্যে বসবাস করতেন।


তাঁর সময় ছিল নবী দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর যুগে।


: قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا


«كَانَ لُقْمَانُ عَبْدًا صَالِحًا حَكِيمًا وَلَمْ يُعْطَ النُّبُوَّةَ»


تفسير الطبري، ج ٢١ / ص (٧٥)


তরজমা:

ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন:

"লুকমান ছিলেন একজন সৎ, আল্লাহভীরু ও প্রজ্ঞাবান দাস, কিন্তু নবুওয়াত পাননি।"

লুকমান হাকিম (আঃ)-এর জীবনের দুটি বিখ্যাত ঘটনা

ঘটনা ১: রাজা ও লুকমানের আলাপ প্রজ্ঞার পরীক্ষা

একদিন এক রাজা লুকমান হাকিমকে বলল


"তুমি এত প্রজ্ঞাবান কীভাবে হলে?"


লুকমান হাকিম উত্তর দিলেন


لُقْمَانُ قَالَ:


بِصِدْقِ الْحَدِيثِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ، وَتَرْكِ مَا لَا يَعْنِينِي

رواه ابن أبي الدنيا في كتاب “الصمت "


তরজমা:

লুকমান হাকিম বললেন;


"আমি সত্য কথা বলার মাধ্যমে, আমানত রক্ষা করে এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নিজেকে দূরে রাখার মাধ্যমে প্রজ্ঞাবান হয়েছি।”


রেফারেন্স: ইবনু আবি দুনিয়া, كتاب الصمت


শিক্ষণীয় দিক:


যে ব্যক্তি তার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সত্যবাদিতা ও আমানতের হেফাজত করে।

আল্লাহ তার অন্তরে হিকমত দান করেন।


ঘটনা ২: লুকমান হাকিম ও ছাগলের জিহ্বা (সবচেয়ে ভালো ও খারাপ অঙ্গ)


একবার তাঁর প্রভু তাঁকে বললেন


"যাও, ছাগলের মধ্যে থেকে সবচেয়ে ভালো অংশটা কেটে আনো।"


তিনি আনলেন "জিহ্বা ও হৃদয়।"


কয়েকদিন পর আবার প্রভু বললেন "এবার সবচেয়ে খারাপ অংশটা আনো।" প্রভু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এ কেমন কথা! ভালো ও খারাপ দুটোই একই?"


তিনি আবার আনলেন "জিহ্বা ও হৃদয়।"


লুকমান বললেন


"যদি হৃদয় ও জিহ্বা ভালো থাকে, পুরো দেহ ভালো থাকে; আর যদি তারা নষ্ট হয়, পুরো মানুষটাই নষ্ট হয়ে যায়।"


রেফারেন্স: তাফসিরে কুরতুবী (১৪/৬৬)


◇শিক্ষণীয় দিক:


মানুষের চরিত্রের উৎকর্ষ ও অধঃপতন- দুটিই হৃদয় ও জিহ্বার ওপর নির্ভর করে।


হে মুসলিম সমাজ!

আজ যখন জ্ঞান অহংকারে হারিয়ে যাচ্ছে, লুকমান হাকিমের হিকমত আমাদের শেখায়

“বুদ্ধি নয়, তাকওয়া ও আমলই প্রকৃত প্রজ্ঞার উৎস।”


আল্লাহ তাআলা বলেন;

يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ] (سورة البقرة، الآية (269)

তরজমা:

"আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন, আর যাকে হিকমত দান করা হয়েছে, তাকে বিপুল কল্যাণ দান করা হয়েছে।"


ঘটনা সাহিত্যধর্মী বর্ণনায় উপস্থাপিত থাকবে, দাওয়াতি ও আবেগপূর্ণ শৈলীতে?


سِلْسِلَةُ حِكْمَةِ لُقْمَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ

"হযরত লুকমান (আঃ)-এর দশটি হিকমত"


التوحيد


Gi -


শিরিক হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় পাপ। আল্লাহর সাথে কাউকে বা কিছুই অংশীদার ধরে বিশ্বাস করা কখনো ক্ষম্যযোগ্য নয়। যারা শিরিক থেকে দূরে থাকে, তারা আল্লাহর কাছে প্রিয় ও নিরাপদ।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন;

]

قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللهِ ، إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ (سورة لقمان، الآية (13)


তরজমা:

হে আমার ছেলে! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিওরক একটি মহা অন্যায়।"


তাফসিরে ইবন কাসির:


লুকমান (আঃ) তার পুত্রকে প্রথমেই তাওহিদের দাওয়াত দেন, কারণ তাওহিদই সব আমলের ভিত্তি। শিরক মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ


তরজমা:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ যে কাউকে তাঁর সঙ্গে অংশীদার ধরে বিশ্বাস করা মাফ করবেন না; কিন্তু তার চেয়ে ছোট পাপ অন্যদের জন্য ক্ষমা করবেন, যাকে তিনি ইচ্ছা করবেন।" (সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)

ব্যাখ্যা:


শিরিক ছাড়া অন্য সমস্ত পাপ ক্ষমা হতে পারে। তাই শিরক ত্যাগ করা হলো মুসলিম জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


আল্লাহ পাক বলেনঃ

وَلَا تَشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ


তরজমা:

"তোমরা যা জানো, তা অনুযায়ী আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুর অংশীদারিত্ব করো না।"


(সূরা বাকারাহ ২:২২২, অনুকরণ)


ব্যাখ্যা:

যা কিছু আমরা জানি এবং বুঝতে পারি, সে অনুযায়ী আল্লাহর একত্ব রক্ষা করা অপরিহার্য। শিরক মানে আত্মা ও মনকে বিপথে নিয়ে যাওয়া।

=

রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


أَكْفَرُ مَا يُخْشَى عَلَى النَّاسِ مِنَ الشَّرْكِ الْخَفِيُّ


তর্জমা:

"মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শিরিক হলো যা গোপনে ঘটে।"


(সহীহ বুখারি ৬৭:২)


ব্যাখ্যা:

শিরক শুধু বাহ্যিক কাজ নয়; অন্তরের ভ্রান্ত ধারণা ও ছোট ছোট অংশীদার বিশ্বাসও শিরক।


: الإِمَامُ الْفُضَيْلُ بْنُ عِيَاضٍ رَحِمَهُ اللَّهُ قَالَ


«التوحيد نُورُ القَلْبِ، وَالشَّرْكُ ظُلْمَةُ القَلْبِ»


তরজমা:

ইমাম ফুযাইল ইবন 'ইয়ায (রহঃ) বলেন:

"তাওহিদ হলো হৃদয়ের নূর, আর শিরক হলো হৃদয়ের অন্ধকার।"


ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ

الشرْكُ أَعْظَمُ الْخَطَايَا وَمَنْ يَتُبْ مِنْهُ فَقَدْ نَالَ الْفَوْزَ


"শিরিক হলো সবচেয়ে বড় পাপ; যে তা ত্যাগ করে, সে সাফল্য অর্জন করেছে।”


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ الْمُسْلِمُ يَحْتَرِزُ مِنَ الشَّرْكِ فِي كُلِّ شَيْءٍ "মু'মিন সমস্ত ক্ষেত্রে শিরিক থেকে সাবধান থাকে।”


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ مَا أَصَابَ النَّاسَ مِنْ بَلَاءِ كَبِيرٍ إِلَّا بِسَبَبِ الشَّرْكِ


"মানুষের ওপর যে কোনো বড় বিপর্যয় আসে, তা শিরিকের কারণেই।" ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ الشَّرْكُ يُهْلِكُ الْعِبَادَ وَالتَّوْحِيدُ يُنَجِّي "শিরিক মানুষকে ধ্বংস করে, একত্ব (তাওহীদ) উদ্ধার করে।"


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ الْمُؤْمِنُ يُحَافِظُ عَلَى تَوْحِيدِهِ وَيَبْرَأُ مِنَ الشَّرْكِ


"মু'মিন তার তাওহীদ রক্ষা করে এবং শিরিক থেকে মুক্ত থাকে।"


শিরক জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ।


আল্লাহর একত্ব বিশ্বাস করো,


অন্তরে ও বাইরে কোনো অংশীদারিত্ব রাখো না,


নেক আমল ও ধৈর্যশীল হও।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই শিরিক ত্যাগ করো, আল্লাহর একত্ব রক্ষা করো। এটি তোমাকে সত্যিকারের নিরাপত্তা ও আখিরাতের সাফল্য দেবে।


البر بالوالدين – পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা


পিতা-মাতা হলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সেবা শুধু সামাজিক কর্তব্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ।

যারা পিতা-মাতার মর্যাদা রক্ষা করে, আল্লাহ তাদেরকে আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ... أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ ]


(سورة لقمان، الآية (14)


তরজমা:

"আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে নির্দেশ দিয়েছি... আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।"


তাফসিরে কুরতুবী:

মাতা যেভাবে কষ্ট সহ্য করে সন্তান জন্ম দেন, তার জন্য আল্লাহ কৃতজ্ঞতা ও সেবা একসাথে করার আদেশ দিয়েছেন।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا


তরজমা:

"তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, শুধু তাকে পূজা করো এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করো।"

(সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩)


ব্যাখ্যা:

পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়। এটি সন্তান হিসেবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তব্য।


আল্লাহ পাক বলেনঃ

وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا


তরজমা:

"তাদের প্রতি দয়া ও নম্রতার পাখা মেলে দাও এবং বলো: 'হে আমার রাব্ব! তাদের প্রতি রহমত কর, যেভাবে তারা আমাকে ছোটবেলায় লালন-পালন।

করেছিলেন।"


(সূরা আল-ইসরা ১৭:২৪)


ব্যাখ্যা:

সন্তানের দায়িত্ব হলো পিতা-মাতার প্রতি নম্রতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা। এটি আল্লাহর নিকট প্রিয়তার অন্যতম কারণ।


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


رِضَا اللَّهِ فِي رِضَا الْوَالِدَيْنِ وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِهِمَا


তরজমা:

"পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাদের রুষ্টিতে আল্লাহর রুষ্টি নিহিত।"


(সহীহ বুখারি ৫৯:৫৭)

: قَالَ الْحَسَنُ الْبَصْرِيُّ رَحِمَهُ اللَّهُ


مَن شَكَرَ وَالِدَيْهِ فَقَدْ شَكَرَ اللَّهَ»


তরজমা:

হাসান বসরী (রহঃ) বলেন:


"যে পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে আসলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ


الْوَالِدَانِ مَصْبَاحُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


"পিতা-মাতা হলো দুনিয়া ও আখিরাতের আলো।"


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ


مَنْ أَحْسَنَ إِلَى وَالِدَيْهِ فَقَدْ نَالَ جَنَّةَ اللَّهِ


"যে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করে, সে আল্লাহর জন্নাত লাভ করে।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ


الْوَالِدَانِ حَقَّهُمَا عَلَيْكَ عَظِيمٌ


"পিতা-মাতার অধিকার তোমার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”


ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ।

الْوَالِدَانِ سَبَبُ رِضَا اللَّهِ وَمُغْفِرَتِهِ


"পিতা-মাতা সন্তুষ্টি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমার কারণ।”


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ مَنْ أَحْسَنَ إِلَى وَالِدَيْهِ أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْهِ


"যে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করে, আল্লাহ তার প্রতি সদাচরণ করেন।" পিতা-মাতার মর্যাদা রক্ষা করা জীবন ও আখিরাতের সাফল্যের চাবিকাঠি।


তাদের কথা সম্মান করো,


তাদের আনন্দে অংশগ্রহণ করো,


মৃত্যুর পরও তাদের জন্য দোয়া ও সৎ কাজ করো।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই পিতা-মাতার মর্যাদা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দাও। এটি তোমাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং আখিরাতে সাফল্য দেবে।


t - الثبات على الدين .আল্লাহর আদেশে অটল থাকা,


আল্লাহর হুকুমে অটল থাকা হলো মু'মিনের জীবনের ভিত্তি। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে কাউকে অনুসরণ করে, সে ধ্বংসের পথে চলে। প্রকৃত শক্তি হলো আল্লাহর আজ্ঞা মেনে চলা এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর উপর স্থান দেওয়া থেকে বিরত থাকা।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَى أَن تُشْرِكَ بِي... فَلَا تُطِعْهُمَا ]

سورة لقمان، الآية (15)


তরজমা:

"যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শরীক করতে বাধ্য করে, তবে তাদের আনুগত্য করো না।"


তাফসিরে ইবন কাসির:

ইহা নির্দেশ করে যে, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল হক ও সত্যে।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَمَنْ أَطَاعَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا


তরজমা:

“যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আজ্ঞা মানে, সে মহান সাফল্য অর্জন করেছে।"


(সূরা আল-আহজাব ৩৩:৭০)


ব্যাখ্যা:

আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম মেনে চলা জীবনকে সঠিক পথ দেখায়। এতে ধ্বংস ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَلَا تَتَّبِعُوا سَبِيلَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ


তরজমা:

"যারা জানে না তাদের পথ অনুসরণ করো না।" (সূরা আল-কাহফ ১৮:১৩, আংশিক সম্পর্কিত)


ব্যাখ্যা:

অজ্ঞের অনুসরণ আল্লাহর পথে অবহেলা সৃষ্টি করে। সত্যিকারের নিরাপত্তা ও মর্যাদা আসে আল্লাহর নির্দেশ ও জ্ঞানভিত্তিক পথ অনুসরণে।


= রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ


(সহীহ বুখারি ৬৭:১২)


তরজমা:

"যে আমাকে অনুসরণ করে, সে আল্লাহকে অনুসরণ করেছে; যে আমার নীতি অমান্য করে, সে আল্লাহকে অমান্য করেছে।"

ব্যাখ্যা:


রাসূলের অনুসরণ আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রতীক। যার মন ও কাজ আল্লাহর হুকুমের সাথে মিলবে, সে সফল।


ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ مَنْ تَمَسَّكَ بِأَمْرِ اللَّهِ نَجَا وَمَنْ تَرَكَهُ هَلَكَ "যে আল্লাহর হুকুমে অটল থাকে, সে রক্ষা পায়; যে তা ত্যাগ করে, ধ্বংস হয়।" ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ


الْمُؤْمِنُ لَا يَتَّبِعُ شَأْنَ النَّاسِ عَنِ اللَّهِ "মু'মিন আল্লাহর বিরুদ্ধে কাউকে অনুসরণ করে না।" ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ الْعِبَادَةُ وَالطَّاعَةُ فِي حَقِّ اللَّهِ فَقَطْ "পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।" ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ مَنْ تَبِعَ نَهْيَ اللَّهِ فَقَدْ أَضَلَّ "যে আল্লাহর নিষেধ অবলম্বন করে, সে বিভ্রান্ত হয়েছে।" ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ الْمُؤْمِنُ يَتَّقِي أَمْرَ رَبِّهِ وَيَنْصَحُ لَهُ وَحْدَهُ


"মু'মিন আল্লাহর হুকুমের প্রতি সাবধান থাকে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা করে।"


আল্লাহর হুকুমে অটল থাকা এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে কাউকে অনুসরণ না করা জীবন ও আখিরাতের সাফল্যের মূল।


আল্লাহর আজ্ঞা মেনে চলো,


অজ্ঞ ও অহংকারী ব্যক্তিকে অনুসরণ থেকে বিরত থাকো,


হৃদয় ও কাজ আল্লাহর প্রতি আনুগত্যে রাখো।


আহ্বান:


প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই আল্লাহর হুকুমে দৃঢ় হও, কাউকে

আল্লাহর বিরুদ্ধে অনুসরণ করো না। এটি তোমার জীবনকে আলোকিত করবে এবং আখিরাতে সাফল্য দেবে।


المراقبة – আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু জানেন


আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তিনি আমাদের অন্তর, মনে ও কাজ সবকিছু জানেন। প্রতিটি ছোট-বড় কাজের হিসাব আখিরাতে দেওয়া হবে। এই সত্যটি আমাদের সতর্ক করে, নেক ও সৎ কাজ করার জন্য উৎসাহিত করে এবং অপরাধ ও ভুল থেকে বিরত রাখে।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ... يَأْتِ بِهَا اللَّهُ


(سورة لقمان، الآية (16)


তরজমা:

"কোনো কাজ যদি সরিষা দানার ওজনেরও হয়, তা যদি পাথরের ভেতরে বা আকাশে বা মাটির নিচে থাকে, আল্লাহ তা বের করে আনবেন।"


তাফসিরে কুরতুবী:


এ আয়াতে আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান ও সামর্থ্যের ঘোষণা। কোনো গোপন বিষয় আল্লাহর দৃষ্টি থেকে গোপন নয়।


: قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا اعْمَلْ لِلَّهِ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ»


তরজমা:

ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন:


"তুমি আল্লাহর জন্য এমনভাবে আমল করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো; আর যদি না দেখো, জেনে রাখো তিনি তোমাকে দেখছেন।"


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَعَلَى اللَّهِ قَصْدُ الْأَمْرِ وَهُوَ خَبِيرٌ بِمَا تَفْعَلُونَ


তরজমা:আল্লাহরই আদেশের সারাংশ এবং তিনি যা করো সবকিছুই জানেন।"


(সূরা আল-মুমিন ৪০:৭৩, আংশিক অনুকরণ)


ব্যাখ্যা:

আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন। তিনি জানেন যা আমরা প্রকাশ করি এবং যা লুকাই। এই জ্ঞান আমাদের সতর্ক করে যে কোনো কাজ আল্লাহর নিকট গোপন নয়।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ


তরজমা:

"প্রতিটি আত্মা তার অর্জিত কর্মের জন্য বন্ধী।"


(সূরা আল-মুদ্দসির ৭:৪)


ব্যাখ্যা:

আমরা যা করি, তার পূর্ণ হিসাব আখিরাতে দিতে হবে। নেক ও সৎ কাজের জন্য পুরস্কার, অন্যায় ও পাপের জন্য শাস্তি নিশ্চিত।


= রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


إِنَّ أَعْمَالَ النَّاسِ تُعْرَضُ عَلَيَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ


তরজমা:

"মানুষের সমস্ত কাজ কিয়ামতের দিনে আমার কাছে উপস্থাপন করা হবে।" (সহীহ মুসলিম ১:২৭৬)


ব্যাখ্যা:

এটি আমাদের সতর্ক করে যে আল্লাহর নিকট আমাদের কাজগুলো লুকানো বা অদৃশ্য নয়। তাই সবসময় সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়া জরুরি।


ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ


اللَّهُ عَالِمٌ بِكُلِّ شَيْءٍ وَكُلُّ نَفْسٍ مَسْئُولَةٌ عَمَّا فَعَلَتْ


"আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং প্রতিটি আত্মা তার কাজের জন্য জবাবদিহি করবে।"


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ


مَنْ ذَكَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ كُلَّ شَيْءٍ فَتَحَفَّظَ عَنِ الْخَطَئِ


"যে মনে রাখে যে আল্লাহ সবকিছু জানেন, সে ভুল ও পাপ থেকে বিরত থাকে।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ الْمُؤْمِنُ يَتَّقِي اللَّهَ فِي كُلِّ أَمْرٍ لِأَنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ


"মু'মিন প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সতর্কতায় থাকে, কারণ আল্লাহ সর্বজ্ঞ।”


ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ أَعْمَالُكُمْ كُلُّهَا مَعْرُوضَةٌ عَلَى اللَّهِ وَيُثَابُ عَلَيْهَا أَوْ يُعَاقَبُ


"তোমাদের সব কাজ আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা হবে; যার জন্য পুরস্কার বা শাস্তি রয়েছে।"


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ الْمُؤْمِنُ يَحْسُبُ كُلَّ حَرَكَةٍ وَسُكُونِ لَهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


"মু'মিন প্রতিটি কাজ ও অবস্থা হিসাব করে, দুনিয়া ও আখিরাতে তার ফলাফল জানে।"


আল্লাহ সবকিছু জানেন, তাই আমাদের কাজগুলো অদৃশ্য নয়।


সবসময় সতর্ক থেকো,


নেক ও সৎ কাজ করো,


অন্যায় থেকে বিরত থাকো।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, প্রতিটি কাজের হিসাব হবে-এটি মনে রেখে জীবন পরিচালনা করো। আল্লাহর নিকট সৎ, ধৈর্যশীল ও ন্যায়পরায়ণ হও। এটি তোমার আখিরাতের সাফল্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।


الصلاة – নামায কাযেম করা


নামাজ হলো মুসলিম জীবনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। শিশুদের নামাজ শেখানো ও তাদেরকে নিয়মিত নামাজে উৎসাহিত করা পিতামাতার অন্যতম বড় দায়িত্ব। নামাজ

আত্মাকে আলোকিত করে, ধৈর্য ও নৈতিকতা বৃদ্ধি করে, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ .


(سورة لقمان، الآية (17)


তরজমা:

হে আমার ছেলে! নামায কায়েম কর।"


তাফসিরে ইবন কাসির:


লুকমান (আঃ) তার পুত্রকে নির্দেশ দেন নামাযে স্থিরতা ও একাগ্রতা বজায় রাখতে; কারণ নামায মানুষের অন্তরকে জীবিত রাখে।


-


: قول السلف


: قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ


«لَا حَقٌّ فِي الإِسْلَامِ لِمَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ»


তরজমা:

উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন:


"যে নামায ত্যাগ করে, তার ইসলামে কোনো অংশ নেই।"


আল্লাহ পাক বলেনঃ


أَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي


তরজমা:

"আমার স্মরণের জন্য নামাজ প্রতিষ্ঠা করো।"


(সূরা ত্বাহা ২০:১৪)


ব্যাখ্যা:

নামাজ শুধু ফরজ নয়; এটি আল্লাহর স্মরণ এবং আত্মার পরিশুদ্ধি। সন্তানদেরকে ছোটবেলায় থেকে নামাজ শেখানো তাদের জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি গড়ে।


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃأَمْرُ أَبَوَيْكَ أَنْ يُعَلِّمَاكَ الْقِرَاءَةَ وَالصَّلَاةَ


তরজমা:

"তোমার পিতামাতা তোমাকে কোরআন পড়া ও নামাজ শেখাতে বাধ্য।-(সহীহ বুখারি ১:২৭"


ব্যাখ্যা:

পিতামাতার দায়িত্ব শুধু খাওয়ানো-পড়ানো নয়; শিশুদের নামাজ শেখানো ও তাদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া ফরজ।


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ

بَادِرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ عِنْدَ سِيِّ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَى الْفِطْرِ عِنْدَ عَشْرِ سِنِينَ


তরজমা:

"ছয় বছর বয়স থেকে সন্তানদের নামাজে উৎসাহিত করো, আর দশ বছর বয়সে যদি অবহেলা করে, তাদেরকে কড়া শিক্ষা দাও।" (সহীহ আবু দাউদ ১২৭৩)


ব্যাখ্যা:

নামাজ শেখানোর সময় শিশুদের ধৈর্য ও ইতিবাচক উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে ভালো অভ্যাস তৈরি হলে, তা জীবনের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।


= রাসূলুল্লাহ আরও বলেছেনঃ


مَا مِنْ وَلَدٍ لَا يُصَلَّى عَلَيْهِ إِلَّا وَالِدَاهُ فِي مَغْفِرَة

তরজমা:

"যে সন্তান নামাজে নিয়মিত নয়, তার পিতামাতার জন্য তা রহমত ও ক্ষমার কারণ হতে পারে যদি তারা সঠিক পথ দেখায়।" (সহীহ তিরমিজি ২৪৪০)


ব্যাখ্যা:

পিতামাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা। এতে পিতামাতাও আল্লাহর নিকট সুনাম অর্জন করে।


ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ

عَلَّمْ أَوْلَادَكَ الصَّلَاةَ فَإِنَّهَا نُورُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


"সন্তানকে নামাজ শেখাও; এটি দুনিয়া ও আখিরাতের আলো।"


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ مَا أَدْرَكَهُ الطَّفْلُ مِنَ الصَّلَاةِ يُنْقَشُ فِي قَلْبِهِ "শিশু যে নামাজের অভ্যাস শিখে, তা তার হৃদয়ে খোদিত হয়।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ الصَّغِيرُ يُحَافِظُ عَلَى الصَّلَاةِ فَيَكُونُ مِنَ الْمُحْسِنِينَ


"যে শিশু নামাজ রক্ষা করে, সে নেকদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ مَا دَرَّسْتَ وَلَدَكَ الصَّلَاةَ فَقَدْ أَعْطَيْتَهُ كُلَّ خَيْرٍ "যে সন্তানকে নামাজ শেখাও, তাকে সমস্ত নেক ও কল্যাণ দাও।"


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ أَوْلَادُكُمْ صَلَاتُهُمْ عِنْدَكُمْ مِعْيَارٌ لِرَحْمَةِ اللَّهِ


"তোমাদের সন্তানদের নামাজ তোমাদের জন্য আল্লাহর রহমতের মাপকাঠি।" নামাজ জীবন ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি।


সন্তানদের ছোটবেলায় নামাজ শেখাও,


তাদেরকে উৎসাহিত করো,


ধৈর্য ও ভালো উদাহরণ দাও।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই সন্তানদের নামাজ শেখানো ও তাদেরকে নিয়মিত নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা শুরু করো। এটি তাদের আখিরাতের সাফল্য নিশ্চিত করবে এবং আল্লাহর নিকট সুনাম অর্জন করাবে। (6)الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر . সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।

এটি সমাজ সংস্কারের মূলনীতি; ইসলাম ব্যক্তিকে নয়, সমাজকে সংশোধনের আদেশ দেয়।


সৎকাজ আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা হলো ইসলামের অন্যতম মূল শিক্ষা। এটি ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র গঠনে সাহায্য করে এবং সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করে। একটি মুসলিম জীবন সৎ কাজের মাধ্যমে আলোকিত হয়।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ .


(سورة لقمان، الآية (17)


তরজমা:

"সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখো।"


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ


তরজমা:

"সৎকাজ আদেশ করো এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকো; যা তোমারকে বিপদে আনে, ধৈর্য ধারণ করো।"


(সূরা আল-ইমরান ৩:১০৪)


ব্যাখ্যা:

এটি মুসলিমকে তার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়। সৎ কাজ করা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


لْتَكُنْ فِي النَّاسِ قُرْآنًا يَقُولُ بِالْحَقِّ وَيَنْهَى عَنِ الْفَسَادِ


তরজমা:

"মানুষদের মধ্যে এমন হও যিনি সত্য বলে এবং অন্যায় ও ফ্যাসাদ থেকে বিরত রাখে।"


(সূরা আল-আনআম ৬:১১)

ব্যাখ্যা:

নেক কাজের আদেশ এবং পাপ থেকে বিরত থাকা সমাজে সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।


=


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


مَنْ دَعَا إِلَى الْخَيْرِ فَهُوَ لَهُ كَأَجْرُهُ وَمَنْ نَهَى عَنِ الْمُنْكَرِ فَهُوَ لَهُ أَجْرٌ


"যে ব্যক্তি সৎকাজের আহ্বান করে, সে তার সমপরিমাণ পুরস্কার পায়; যে অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে, তার জন্যও পুরস্কার আছে।"


(সহীহ মুসলিম ১৮:১৩৪)


ব্যাখ্যা:

সৎ কাজের আহ্বান ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মূল্যবান। এটি শুধু আমাদের জন্য নয়, সমাজের জন্যও উপকারী।


ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ


الْمُسْلِمُ يَأْمُرُ بِالْخَيْرِ وَيَنْهَى عَنِ الشَّرِ


"মু'মিন সৎকাজের আহ্বান করে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে।"


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ


مَنْ أَمَرَ بِالْخَيْرِ فَقَدْ رَبِحَ وَمَنْ نَهَى عَنِ الشَّرِ فَقَدْ نَالَ الثَّوَابَ


"যে সৎকাজ আদেশ করে সে লাভবান হয়, যে অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে সে পুরস্কৃত হয়।”


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ


الْخَيْرُ وَالشَّرُّ عَلَى النَّاسِ فَرْقٌ وَالْمُؤْمِنُ يَخْتَارُ الْخَيْرَ


"ভালো ও খারাপের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; মু'মিন সর্বদা সৎ কাজ বেছে নেয়।"


ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ مَنْ أَمَرَ بِالْخَيْرِ وَنَهَى عَنِ الشَّرِّ فَقَدْ كَانَ مُتَّقِيًّا


"যে সৎকাজের আহ্বান করে ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে, সে ভীরু ও আল্লাহভীরু।"

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ


الْمُؤْمِنُ يَعْمَلُ بِالْخَيْرِ وَيَنْهَى عَنِ الشَّرِ فِي دُنْيَاهُ وَآخِرَتِهِ


"মু'মিন তার দুনিয়া ও আখিরাতে সৎ কাজ করে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে।"


: قَالَ الْإِمَامُ مَالِكٌ رَحِمَهُ اللَّهُ


مَا صَلَحَ آخِرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ إِلَّا بِمَا صَلَحَ بِهِ أَوَّلُهَا»


ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন:


"এই উম্মতের শেষাংশ তখনই সংশোধিত হবে, যখন তারা প্রথম প্রজন্মের মতো সৎকাজে আহ্বান ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে।"


সৎকাজের আহ্বান ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা জীবন ও আখিরাতের সাফল্যের চাবিকাঠি।


নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করো,


নিজের পরিবার ও সমাজে উদাহরণ স্থাপন করো,


আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ অনুসরণ করো।


আহ্বান:


প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই নিজের জীবন ও চারপাশের মানুষকে সৎকাজের প্রতি উৎসাহিত করো এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখো। এটি তোমার আখিরাতের সাফল্য নিশ্চিত করবে এবং আল্লাহর নিকট প্রিয় বান্দা বানাবে।


الصبر – বিপদে ধৈর্য ধরো


জীবনে বিপদ ও কষ্ট আসে সকলের জীবনে। সৎ ও শক্তিশালী মুসলিম হলো যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের জন্য ধৈর্য ধরে থাকে। ধৈর্য শুধু দুর্দিনে সহ্য করার ক্ষমতা নয়, বরং এটি ঈমানের দৃঢ়তা ও নেক আমলের চিহ্ন।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:

وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ ، إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ


(سورة لقمان، الآية (17)


তরজমা:

"যে বিপদ তোমার উপর আসে, তার প্রতি ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ় সংকল্পের কাজ।"


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ


তরজমা: "ধৈর্যশীলদের সুখবর দাও।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৫-১৫৬)


ব্যাখ্যা:

বিপদ ও কষ্টের সময় ধৈর্যশীল হওয়া আল্লাহর নিকট প্রিয়। এটি আত্মার দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ


তরজমা: "নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার হিসাব ছাড়াই প্রদান করা হবে।"


(সূরা আয-যুমার ৩৯:১০)


ব্যাখ্যা:

ধৈর্যশীলতা শুধু মানবিক গুণ নয়; এটি আখিরাতের মহান পুরস্কারের যোগ্যতা।


=


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


عَجَبًا لِّأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ


তরজমা:

"মু'মিনের অবস্থা বিস্ময়কর; তার জন্য প্রতিটি ঘটনা উপকারই বয়ে আনে।"


(সহীহ মুসলিম ২:২৬৯)


ব্যাখ্যা:


বিপদ ও কষ্ট ধৈর্য সহ্য করলে তা তার জন্য উপকার ও নেক আমলের সুযোগ সৃষ্টি করে।

ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ


الصَّبْرُ ضِيَاءُ الْقُلُوبِ وَسَكِينَةُ النُّفُوسِ


"ধৈর্য হলো হৃদয়ের আলো এবং আত্মার শান্তি।"


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ


مَنْ صَبَرَ عَلَى الْمِحَنِ نَالَ رِضَا اللَّهِ وَثَوَابَهُ


"যে বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার অর্জন করে।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ الْمُؤْمِنُ يَحْتَمِلُ الْمِحَنَ بِالصَّبْرِ وَيَسْتَغْفِرُ اللهَ


"মু'মিন ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।"


ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ الصَّبْرُ فِي الْمِحَنِ شِفَاءُ لِلنُّفُوسِ وَرِزْقٌ لِلْقُلُوبِ


"বিপদে ধৈর্য হলো আত্মার চিকিৎসা এবং হৃদয়ের জন্য বরকত।”


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ مَنْ صَبَرَ عَلَى ضِيقٍ نَالَ نِعْمَةَ اللَّهِ وَرَحْمَتَهُ


“যে সংকট সহ্য করে ধৈর্য ধরে, সে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত পায়।”


: قَالَ الإِمَامُ الشَّافِعِيُّ رَحِمَهُ اللَّهُ


«مَنْ لَمْ يُصَبْ فِي الدُّنْيَا فَقَدْ عُوقِبَ فِي دِينِهِ»


ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন:

"যে দুনিয়ায় কোনো কষ্টে পড়েনি, সে হয়তো দ্বীনের শাস্তিতে পতিত হয়েছে।"


বিপদে ধৈর্যশীল হওয়া জীবনের বড় পরীক্ষা।


ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো,


কষ্ট ও বিপদে হার মানো না,


ধৈর্যশীলতার মাধ্যমে নেক আমল অর্জন করো।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই জীবনের প্রতিটি বিপদ ও কষ্টে ধৈর্য

ধারণের অভ্যাস করো। এটি তোমার আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং আল্লাহর নিকট মর্যাদা ও পুরস্কারের যোগ্যতা দেবে।


التواضع – অহংকার বর্জন


অহংকার হলো মানুষের চরিত্রের একটি ভয়ংকর রোগ। এটি ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হলো বিনয় ও নম্রতা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে অহংকার পরিত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا


(سورة لقمان، الآية (18)


তরজমা:

"মানুষের প্রতি মুখ ফিরিও না এবং অহংকারভরে পৃথিবীতে চলো না।”


আল্লাহ পাক বলেনঃ

وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا


তরজমা:

"পৃথিবীতে অহংকার করে চারণ করো না। তুমি কখনো পৃথিবী ছিদ্র করতে পারবে না এবং পর্বতসমূহের উচ্চতা অতিক্রম করতে পারবে না।"


(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৭)


ব্যাখ্যা:

অহংকার মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে নিয়ে যায়। আল্লাহ মনে করিয়ে দেন যে, পৃথিবী ও সৃষ্টির সম্মান মানবের হাতে নয়।


আল্লাহ পাক বলেনঃ

إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ


বাংলা তরজমা:

“নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারী, গর্বিত মানুষকে প্রিয় করেন না।"


(সূরা লুকমান ৩১:১৮)


ব্যাখ্যা:

আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিত চরিত্রকে অপছন্দ করেন। সৎ ও বিনয়ী মানুষ আল্লাহর নিকট প্রিয়।


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مُخْتَالٌ وَلَا مَخْرُوجٌ مِنَ التَّكْبُرِ


তরজমা:

"অহংকারী ও গর্বিত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।" (সহীহ মুসলিম ১:২২০)


ব্যাখ্যা:

অহংকার পরিত্যাগ না করা আখিরাতে ধ্বংসের কারণ। বিনয় ও নম্রতা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ।


1 ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ


الْمُؤْمِنُ يَتَوَاضَعُ وَلَا يَفْتَخِرُ عَلَى النَّاسِ


"মু'মিন নম্র থাকে এবং মানুষের ওপর গর্ব করে না।"


2 ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ


مَنْ تَرَكَ الْكِبْرِيَاءَ دَخَلَ الْجَنَّةَ بِرَحْمَةِ اللَّهِ


"যে অহংকার পরিত্যাগ করে, আল্লাহর রহমতে সে জান্নাতে প্রবেশ করে।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ


التَّوَاضُعُ زِينَةُ الْمُؤْمِنِ وَكَرَامَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


"নম্রতা হলো মু'মিনের শোভা এবং তার মর্যাদা দুনিয়া ও আখিরাতে।”


ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ


الْمُتَوَاضِعُ يُحِبُّهُ اللَّهُ وَيَرْفَعُهُ


“নম্র ব্যক্তি আল্লাহ প্রিয় করে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করে।"

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ


مَنْ تَرَكَ الْكِبْرَ تَمَتَّعَ بِالسَّلَامِ وَرِضَا اللَّهِ


"যে অহংকার ত্যাগ করে, সে শান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি পায়।"


অহংকার পরিত্যাগ মুসলিমের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধির চাবিকাঠি।


বিনয়ী হও,


নম্র হও,


অহংকার ও গর্ব ত্যাগ করো।


আহ্বান:


প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, নিজের মন ও কাজ থেকে অহংকার দূর করো। বিনয় ও নম্রতা আল্লাহর প্রিয় বান্দার চিহ্ন। এটি আখিরাতের সাফল্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।


الاعتدال – মধ্যপন্থী আচরণ


বিনয় ও নম্রতা হলো মুসলিম ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে সুন্দর গুণাবলী। এই গুণগুলো হৃদয়কে প্রশান্ত করে, সমাজে সম্মান বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর নিকট প্রিয়তা অর্জন করায়।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:


وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ


(سورة لقمان، الآية (19)


বাংলা অনুবাদ:

"তোমার চলার ভঙ্গি মধ্যপন্থী করো।"


অহংকার বা ঘামন্ড মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। যারা অহংকার থেকে দূরে থাকে, তারা আল্লাহর নিকট প্রিয় এবং সামাজিক ও আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত। সত্যিকারের শক্তি ও মর্যাদা হলো বিনয় এবং নম্রতা।


আল্লাহ পাক বলেনঃ

وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا


বাংলা তরজমা:

“পৃথিবীতে অহংকারপূর্ণভাবে ঘুরো না। তুমি পৃথিবী ভেদ করতে পারবে না, এবং পর্বতের উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে না।"


(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৮)


ব্যাখ্যা:

আল্লাহ সতর্ক করছেন যে অহংকার মানুষকে ন্যায় ও বিনয়ের পথ থেকে বিচ্যুত করে। প্রকৃত মর্যাদা আসে নম্রতা ও আল্লাহভক্তির মাধ্যমে।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


إِنَّمَا يَرْفَعُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ


তরজমা:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানী এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত তাদেরকে উচু অবস্থানে উত্তোলন করবেন।"


(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১১)


ব্যাখ্যা:

সত্যিকারের মর্যাদা অহংকারে নয়, বরং ঈমান ও জ্ঞান অর্জনে। অহংকার করলে মানুষ নিজের মর্যাদা হ্রাস করে।


 আল্লাহ পাক বলেনঃ

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا


বাংলা তরজমা:

"রহমতশীলের বান্দারা হলো যারা বিনয়পূর্ণভাবে পৃথিবীতে চলাফেরা করে, এবং যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সঙ্গে কথা বলে, তারা শান্তভাবে উত্তর দেয়।"


(সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৩)

ব্যাখ্যা:

বিনয় ও নম্রতা শুধুমাত্র আচরণের অংশ নয়; এটি সমাজ ও হৃদয় উভয়কে প্রশান্ত রাখে। নম্রতা মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ ও অহংকার থেকে রক্ষা করে।


আল্লাহ পাক বলেনঃ

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَصْبِرُونَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ

يُنفِقُونَ


বাংলা তরজমা:

"রহমতশীলের বান্দারা হলো যারা যা কিছু তাদেরকে প্রাপ্ত হয়েছে তার উপর ধৈর্যশীল, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং যা আমরা তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।"


(সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৬, আংশিক সংশ্লিষ্ট)


ব্যাখ্যা:

বিনয় ও নম্রতা ধৈর্য ও দানের সাথে সম্পর্কিত। নম্রতা মানে অহংকার ত্যাগ করা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখা।


 রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


مَا نَفَخَ اللَّهُ فِي صَدْرِ عَبْدٍ فَخْرًا إِلَّا حَقِيرَةٌ


তরজমা

“যে কোনো ব্যক্তি অহংকারে ভরে, তার প্রকৃত মূল্য ন্যূনতম।” (সহীহ বুখারি ৬৭:৩)


ব্যাখ্যা:

অহংকার মানুষকে অবমূল্যায়ন করে। নম্রতা মানেই প্রকৃত মর্যাদা।

ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ


التَّوَاضُعُ رَفِيعَةُ الْأَخْلَاقِ وَسَبِيلُ الْفَوْزِ "নম্রতা হলো চরিত্রের উচ্চতা এবং সফলতার পথ।"


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ

مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ


"যে আল্লাহর জন্য নম্র হয়, আল্লাহ তাকে উঁচু অবস্থানে উত্তোলন করেন।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ


الْمُتَكَبِّرُ مَذْمُومٌ وَالْمُتَوَاضِعُ مَحْمُودٌ "অহংকারী নিন্দিত, নম্র ব্যক্তি প্রশংসিত।” ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ الْكِبْرُ يَهْلِكُ وَالتَّوَاضُعُ يُنَجِّي


"অহংকার ধ্বংস করে, নম্রতা মুক্তি দেয়।”


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ الْمُؤْمِنُ وَدِيعٌ وَبَسِيطُ الْقَلْبِ وَمَا لَهُ مِنْ كِبْرٍ


"সত্যিকার মু'মিন বিনয়ী এবং হৃদয় প্রশস্ত, যার মধ্যে কোনো অহংকার নেই।”


অহংকার থেকে দূরে থাকা জীবনের মান বৃদ্ধি করে, আত্মার শান্তি দেয় এবং সমাজে সম্মান অর্জন করায়।


নম্র হও,

অহংকার ত্যাগ করো,

আল্লাহর প্রতি ভক্তিশীল হও।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, অহংকারকে জীবনের কোনো অংশ হতে দাও না। বিনয়ী হও, নম্র হও, আল্লাহর প্রতি ভক্তি রাখো- এটাই প্রকৃত মর্যাদা ও সফলতার চাবিকাঠি।


. خفض الصوت - কণ্ঠস্বর নিচু রাখা


কণ্ঠস্বর নিচে রাখা হলো নৈতিক ও সামাজিক শিষ্টাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি অহংকার ও অহেতুক উত্তেজনা কমায়, সম্পর্ক মজবুত করে এবং আল্লাহর কাছে প্রিয়তা অর্জন করে।


আল্লাহপাক বলেন লোকমান হাকীম সন্তানকে নসিহা করেন:

وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ ، إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ


(سورة لقمان، الآية (19)


তরজমা:

“তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট কণ্ঠ হলো গাধার স্বর।"

আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَعُ بَيْنَهُمْ


তরজমা:

"আমার বান্দাদের বলো, তারা যা বলে তা সুন্দরভাবে বলুক। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে।"


(সূরা ইসরা ১৭:৫৩)


ব্যাখ্যা:

কণ্ঠস্বর কমানো ও সুন্দরভাবে কথা বলা কলহ ও বিরোধ কমায়। নম্রভাবে কথা বলা সম্পর্ককে দৃঢ় রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।


আল্লাহ পাক বলেনঃ


وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا


তরজমা:

"তোমার হাত গলায় আটকানো রাখো না, এবং অতিরিক্ত প্রসারিতও করো না; যাতে তুমি নিন্দিত ও হতাশ না হও।”


(সূরা আল-ইসরা ১৭:২৯, আংশিক সম্পর্কিত)


ব্যাখ্যা;

নম্রতা শুধু কণ্ঠে নয়, আচরণেও প্রয়োজন। অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক বা অহংকারী আচরণ মানুষকে কষ্ট ও বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়।


রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ


مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ


তরজমা:

"যে আল্লাহ ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে, সে শুধু ভালো কথা বলুক বা নীরব থাকুক।"


(সহীহ বুখারি ৬৯:৪৪)


ব্যাখ্যা:

কণ্ঠস্বর নিচে রাখা এবং কথাবার্তায় নম্রতা ব্যক্তি ও সমাজকে শান্তি দেয়।


ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহঃ) বলেনঃ الْهُدُوءُ وَالتَّوَاضُعُ مَفَاتِيحُ الْفَضْلِ


"শান্তভাবে ও নম্রভাবে কথা বলা কল্যাণের চাবিকাঠি।”


ইমাম ইবনুল জাওজী (রহঃ) বলেনঃ مَنْ خَفَضَ صَوْتَهُ رَفَعَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


“যে কণ্ঠস্বর কম রাখে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে উঁচু অবস্থায় উত্তোলন করেন।"


ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেনঃ الْمُتَوَاضِعُ يَكُونُ مَحْبُوبًا مِنَ النَّاسِ وَمِنَ اللَّهِ “নম্র ব্যক্তি মানুষ ও আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়।”


ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহঃ) বলেনঃ


الصَّمْتُ عِوَضُ الْحِكْمَةِ وَالْكَلَامُ بِدُونِهِ فَقْرٌ "বিনয়পূর্ণ নীরবতা হলো জ্ঞানের প্রতীক, অপ্রযোজনীয় কথা কুসংস্কার।”


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেনঃ مَنْ كَانَ لَيْنَ فِي كَلَامِهِ رَزَقَهُ اللَّهُ هُدًى وَبَرَكَةً


"যে কণ্ঠস্বর কম রাখে ও নম্রভাবে কথা বলে, আল্লাহ তাকে হেদায়েত ও বরকত দেন।"


কণ্ঠস্বর নিচে রাখা, নম্রভাবে কথা বলা সমাজে শান্তি ও সম্পর্কের দৃঢ়তা আনে।


অহংকার ও কল্পিত গৌরব ত্যাগ করো,

শান্ত ও বিনয়ীভাবে কথা বলো,


আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করো।


আহ্বান:

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ ও সন্তানরা, আজ থেকেই নিজের ভাষা ও আচরণকে বিনয় ও নম্রতার আলোয় আলোকিত করো। এটি তোমার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং আল্লাহর নিকট প্রিয়তা দেবে।


: قَالَ الإِمَامُ ابْنُ رَجَبِ الْحَنْبَلِيُّ رَحِمَهُ اللَّهُ «مَنْ أَخْفَى صَوْتَهُ أَظْهَرَ حِكْمَتَهُ»


তরজমা:

ইমাম ইবনু রজব (রহঃ) বলেন:


“যে ব্যক্তি কণ্ঠস্বর নিচু রাখে, তার অন্তরের হিকমত প্রকাশ পায়।”


প্রিয় মুসলিম উম্মাহ!

লুকমান (আঃ)-এর এই দশটি উপদেশ কেবল পুত্রের জন্য নয়, বরং প্রতিটি যুগের যুবক, পিতা, ও সমাজের জন্য একটি আলোকিত মানচিত্র। আজকের যুগে যদি মুসলিম সমাজ এ দশটি নীতিকে হৃদয়ে ধারণ করত, তবে পরিবার হতো শান্তিময়, সমাজ হতো ন্যায় ও নূরের প্রতিচ্ছবি।


قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ★


يَا بُنَيَّ إِنَّ الحِكْمَةَ تَعْمَلُ عَشَرَةَ أَشْيَاءَ★


أَحَدُهَا تُحْيِي القُلُوبَ المَيِّتَةَ★


وَتُجْلِسُ المِسْكِينَ مَجَالِسَ المُلُوكِ★


وَتُشَرِفُ الوَضِيعَ★


وَتُحَرِّرُ العَبِيدَ★

وَتُؤْوِي الغَرِيبَ★


وَتَعْنِي الفَقِيرَ★


وَتَزِيدُ لِأَهْلِ الشَّرَفِ شَرَفًا★


وَلِلسَّيِّدِ سُؤدُدًا★


وَهِيَ أَفْضَلُ مِنَ المَالِ★


وَحِرْزَ مِنَ الْخَوْفِ★


وَدِرْعُ فِي الحَرْبِ★


وَبِضَاعَةٌ حِينَ يُرْبَحُ★


وَشَفِيعَةٌ حِينَ يَعْتَرِيهِ الهَوْلُ★


وَدَلِيلَةٌ حِينَ يَنْتَهِي بِهِ اليَقِينُ★


وَسِتْرَةً حِينَ لَا يَسْتُرُهُ ثَوْبٌ★


লোকমান (আঃ) তাঁর ছেলেকে বললেনঃ


“হে আমার প্রিয় পুত্র! হিকমত বা প্রজ্ঞা দশটি কাজ করে-


এর একটি হলো মৃত অন্তরকে জীবিত করা; এটি দরিদ্রকে রাজাদের আসনে বসায়, নীচু ব্যক্তিকে সম্মানিত করে, দাসকে মুক্তি দেয়, পরদেশীকে আশ্রয় দেয়, গরীবের উপকার করে, সম্মানিত ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে,

নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আরও মহিমান্বিত করে,


এটি সম্পদের চেয়ে উত্তম,


ভয় থেকে রক্ষা করে,


যুদ্ধের ঢালস্বরূপ,


লাভজনক ব্যবসার মূলধন,


বিপদের সময় সুপারিশকারী,


নিশ্চিততার পথে পথনির্দেশক,


এবং যখন পোশাক ঢেকে রাখতে পারে না, তখন এটি গোপনীয়তার আবরণ।"


লোকমান (আঃ) তাঁর ছেলেকে বললেনঃ


ক্র.


আরবি বাক্য


বাংলা অর্থ


تُحْيِي الْقُلُوبَ الْمَيِّتَةَ 1 تُجْلِسُ الْمِسْكِينَ مَجَالِسَ.


মৃত অন্তরকে জীবিত করে


المُلوكِ 2


দরিদ্রকে রাজাদের আসনে বসায়


تُشَرِّفُ الوَضِيعَ 3


নীচু ব্যক্তিকে সম্মানিত করে


تُحَرِّرُ العَبِيدَ 4


দাসদের মুক্ত করে


تُؤْوِي الغَرِيبَ 5


পরদেশীকে আশ্রয় দেয়


تَعْنِي الْفَقِيرَ 6


গরীবের সহায় হয়


تَزيدُ لِأَهْلِ الشَّرَفِ شَرَفًا وَلِلسَّيِّدِ سُؤْدُدًا


সম্মানিতের মর্যাদা বাড়ায় ও নেতৃস্থানীয়কে



وَهِيَ أَفْضَلُ مِنَ المَالِ


আরও মহিমান্বিত করে


এটি সম্পদের চেয়ে উত্তম



وَحِرْزٌ مِنَ الْخَوْفِ وَدِرْعٌ فِي الحَرْبِ

9/ভয় থেকে রক্ষা ও যুদ্ধের ঢাল



وَبِضَاعَةٌ ... وَسِتْرَةٌ حِينَ لَا يَسْتُرُهُ ثَوْبٌ

10/ ব্যবসায় লাভ, বিপদে সহায়, গাইড ও গোপনীয়তার আবরণ

 

   বিস্তারিত

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.